আলাপ প্রতিনিধিঃ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গত শতাব্দীতে লিখেছিলেন—
“কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো ভারে বলে গাঁয়ের লোক
মেঘলাদিনে দেখেছিলেম মাঠে কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।”
১৩০৭ বঙ্গাব্দের ৫ আষাঢ়, শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে রচিত হয়েছিল কবিগুরুর অমর কবিতা ‘কৃষ্ণকলি’। এই কবিতার কালো মেয়েটি যেন ছিল প্রকৃতির রঙে রাঙা এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি—নিজস্ব সৌন্দর্যে দীপ্ত, আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ। সেই কৃষ্ণকলিকে আজকের যুগে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। আধুনিক সমাজে যেখানে গায়ের রঙের ভিত্তিতে সৌন্দর্য বিচার হয়, সেখানে কৃষ্ণবর্ণ অনেকসময় অবহেলিত। মানুষ প্রসাধনের মাধ্যমে নিজেকে বদলে নিতে চায়, গায়ের প্রকৃত রঙকে আড়াল করে।
তবু এই ভিড়ের মধ্যেই আবির্ভাব ঘটে নবযুগের এক কৃষ্ণকলির—কলকাতার বেহালা অঞ্চলের পুষ্পিতা মন্ডল। যিনি শুধু গায়ের রঙে নয়, কর্মে, চিন্তায় ও শিল্পচর্চায় হয়ে উঠেছেন বাংলার এক অনন্য প্রতিনিধি।
১৯৯৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন পুষ্পিতা। বেহালা গার্লস স্কুল থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করে একাদশ-দ্বাদশ পড়েছেন বেহালা হাইস্কুলে। এরপর বিবেকানন্দ উইমেন্স কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগে গবেষণা করছেন।
তাঁর ছোটবেলা কেটেছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। শৈশব থেকেই নাচের প্রতি গভীর টান থাকলেও পারিবারিক সমস্যা ও অর্থনৈতিক সংকট একসময় সব থামিয়ে দেওয়ার উপক্রম করেছিল। যদিও তাঁর মায়ের ইচ্ছে ছিল—মেয়ে একদিন বড় হয়ে খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী হবেন, কিন্তু পুষ্পিতার মন পড়ে ছিল নৃত্যকলায়। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মা-বাবার উৎসাহে ভর্তি হন শ্রীমতি মৌমিতার ‘নৃত্যালয়া’-তে। কিন্তু সংসারে টানাপোড়েন শুরু হলে তাঁর নাচ শেখা ও পড়াশোনা—দুটোই প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় তাঁর মা সেলাইয়ের কাজ করে মেয়ের শিক্ষা ও নাচের খরচ জুগিয়েছেন। এভাবেই চলেছে পুষ্পিতার লড়াই ও নিজেকে গড়ে তোলার যাত্রা।
২০১২ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে, পুষ্পিতা শুরু করেন নিজের ছোট্ট নৃত্য-প্রতিষ্ঠান। আড়াই বছরের একটি শিশুকে নাচ শেখানোর মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও, ধীরে ধীরে তাঁর একাডেমি গড়ে উঠেছে। বর্তমানে সেখানে ২০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
তাঁর কাছে নৃত্য শুধু শিল্প নয়, বরং এটি বাংলার সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ। একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন—
“নবযুগের কৃষ্ণকলি বাংলার শিল্প ও ঐতিহ্যকে নিয়ে কাজ করতে চায়। অবিভক্ত বাংলার ভেতরে রয়েছে হাজারো শিল্প ও হাজারো ঐতিহ্য। এগুলো নিয়েই আমি কাজ করে যেতে চাই। আমাদের সবার সচেতন হওয়া দরকার, যাতে বাংলা শিল্প, সাহিত্য ও ঐতিহ্য হারিয়ে না যায়। বাংলার ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে চাই।”
নৃত্যের পাশাপাশি পুষ্পিতা কাজ করছেন হস্তশিল্প নিয়েও। তাঁর একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে—“Bedizen” নামে, যেখানে তিনি হাতের তৈরি গিফট আইটেম তৈরি ও বিক্রি করছেন। এই উদ্যোগ শুধু সৃজনশীলতা নয়, বরং একটি বিকল্প স্বনির্ভরতার পথও দেখাচ্ছে নতুন প্রজন্মকে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পুষ্পিতা মন্ডল যেন সত্যিকারের এক 'নবযুগের কৃষ্ণকলি'। যিনি রঙ নয়, শিল্প, শিক্ষা, শ্রম ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে গড়ে তুলছেন নিজের পরিচয়। তিনি প্রমাণ করে চলেছেন—আত্মপরিচয়ের আলো গায়ের রঙে নয়, অন্তরের দীপ্তিতে জ্বলে।
Tags
বিনোদন
